এনামুল হক রাশেদী,চট্টগ্রাম:
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মাছের ঘের, কৃষিজমি ও প্রাণিসম্পদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিতে অনেকেই এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম করছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল হওয়ায় তারা চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামের এক মাছচাষি জানান, ৮০ শতক আয়তনের একটি মাছের ঘেরে প্রায় ৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া ধারও রয়েছে। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে বন্যার পানিতে ঘেরের সব মাছ ভেসে যাওয়ায় তিনি এখন ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা। সরকারি সহায়তার আশ্বাস পেলেও এখনো কোনো কার্যকর সহযোগিতা পাননি বলে জানান তিনি।
একই এলাকার আরেক মৎস্যচাষি রাফি বলেন, তার শতাধিক শতকের মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি আমন ধানের বীজতলাও নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, বন্যার সময় জীবন রক্ষাই ছিল প্রধান চিন্তা। এখন নতুন করে বিনিয়োগ ও ঋণ পরিশোধের চিন্তায় দিন কাটছে।
বাঁশখালীর আরেক খামারি ফারুক জানান, বন্যায় তার দুই হাজার মুরগি মারা গেছে এবং ৫০০ হাঁসের অধিকাংশই ভেসে গেছে। বর্তমানে হাতে রয়েছে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি হাঁস। তার দাবি, বাহারছড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারি তাদের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পুঁজি হারিয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা। এছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও আনোয়ারাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গৃহপালিত পশু-পাখি মারা গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ১৬ হাজার ৫৫৬টি পুকুর, দিঘি ও মাছের ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। প্রায় ৫ হাজার ৬৪৮ হেক্টর জলাশনে ক্ষতির পরিমাণ ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার বেশি। একই সঙ্গে ১৬ হাজার ১৩২ হেক্টর কৃষিজমি এবং ১ হাজার ৪১৭ হেক্টর আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২২২ কোটি টাকারও বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় ধানের বীজ, সার, পশুখাদ্য ও মাছের পোনা বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত এখনো কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। ফলে নতুন করে ঘের, খামার ও কৃষিকাজ শুরু করতে তারা অর্থসংকটে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই অর্থে পশুখাদ্য কিনে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যাকবলিত এলাকায় পশুর ক্ষুরা রোগ প্রতিরোধে ৩৫ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, বন্যায় প্রায় ১৪৪ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা বা নির্দেশনা পাওয়া গেলে উপজেলা পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত যে বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নতুন বরাদ্দ এলে সেটিও পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..